“বাংলাদেশের UHC অর্জনে স্মার্ট পথ: প্রথমে অদক্ষতা দূর করে এফিসিয়েন্সি বাড়ানো, তারপর বাজেট বৃদ্ধি! এতে বর্তমান সম্পদ দিয়েই ৮.৭% উন্নতি সম্ভব।“
আমাদের দেশ বাংলাদেশ, যা অর্থনৈতিক বৃদ্ধির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ, এখনও স্বাস্থ্যসেবা খাতে গভীর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমাদের ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (UHC) সার্ভিস কভারেজ ইনডেক্স (SCI) মাত্র ৫৪, যা বিশ্ব গড় ৭১-এর চেয়ে অনেক নিচে, এবং আউট-অফ-পকেট (OOP) খরচ 72 %—যা লক্ষ লক্ষ পরিবারকে আর্থিক ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান জিডিপির শতাংশ বৃদ্ধিতে নয়; বরং সিস্টেমের অদক্ষতা দূর করে এফিসিয়েন্সি (Efficiency) এবং ইফেক্টিভনেস (Effectiveness) বাড়ানোতে। বাংলাদেশের জন্য সঠিক পথ হলো বর্তমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার—এটি না শুধু অর্থ সাশ্রয় করবে, বরং দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নিশ্চিত করবে। জিডিপির শতাংশ বাড়ানো কোনো সমাধান নয়, কারণ অদক্ষ সিস্টেমে অতিরিক্ত অর্থ অপচয়ই হবে।
আসুন প্রথমে বাস্তবতা দেখি: আমাদের স্বাস্থ্য ম্যানেজমেন্টে বিশাল অদক্ষতা রয়েছে। Vaccancy (পোস্ট খালি থাকা), Mismatch Deployment (যোগ্য কর্মীদের ভুল জায়গায় নিয়োগ), এবং Poor Accountability (অনুপস্থিতি এবং দুর্নীতি) সিস্টেমকে অকার্যকর করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, সেকেন্ডারি হাসপাতালগুলোতে এফিসিয়েন্সি (Efficiency) মাত্র ৭৩-৮০%, —যা বিশ্বব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুসারে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর (LMICs) গড়ের চেয়ে কম। যদি আমরা এই অদক্ষতা না সংশোধন করি, তাহলে জিডিপির শতাংশ বাড়িয়েও ফলাফল সীমিত থাকবে—যেমনটি অনেক উন্নয়নশীল দেশে দেখা যায়, যেখানে উচ্চ ব্যয় সত্ত্বেও ফলাফল কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুসারে, ৭৮.৫% দেশ তাদের স্বাস্থ্য রিসোর্সকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করতে পারে না, এবং এফিসিয়েন্সি বাড়ালে বর্তমান বাজেট দিয়েই UHC ৪-৮% উন্নত করা সম্ভব। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি আরও প্রযোজ্য, কারণ আমাদের বর্তমান বাজেট (জিডিপির ২.৩%)-এর সাথে এফিসিয়েন্সি রিফর্ম করলে UHC ৮.৭% পর্যন্ত উন্নত হতে পারে—যা LMICs-এর গবেষণায় প্রমাণিত।
এই অদক্ষতা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় হলো এফিসিয়েন্সি ( Efficiency) বাড়ানোর ব্যবহারিক পদক্ষেপ। আমরা শুরু করতে পারি ডিজিটাল মনিটরিং ( Digital Monitoring) সিস্টেম চালু করে, যা কর্মীদের অনুপস্থিতি, পারফরম্যান্স এবং রিসোর্স ব্যবহার ট্র্যাক করবে—যেমনটি ভারতের কিছু রাজ্যে সফলভাবে করা হয়েছে, যা অ্যাকাউন্টেবিলিটি ৩০% বাড়িয়েছে। পরবর্তীতে, এইচআর প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে যোগ্য কর্মীদের সঠিক জায়গায় নিয়োগ করা যাবে, যা ভ্যাকান্সি কমাবে এবং সেবার মান বাড়াবে। প্রাইমারি হেলথ কেয়ার (PHC) শক্তিশালীকরণ—যেমন কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আধুনিকীকরণ, প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু এবং সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট উন্নয়ন—এবং গভর্ন্যান্স উন্নয়ন (দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ট্রান্সপারেন্সি এবং পারফরম্যান্স-ভিত্তিক ইনসেনটিভ) এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। এছাড়া, ডেটা-ড্রিভেন ডিসিশন মেকিং চালু করে রিসোর্স অপটিমাইজেশন করা যাবে, যেমন এআই-ভিত্তিক প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে রোগের প্রাদুর্ভাব পূর্বাভাস দিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া। এই ধাপগুলো বাস্তবায়ন করলে, আমরা বর্তমান বাজেট দিয়েই OOP কমাতে পারব এবং SCI বাড়াতে পারব, যা জনগণের জন্য সরাসরি লাভজনক। থাইল্যান্ডের উদাহরণ দেখুন: তারা ২০০২ সালে এফিসিয়েন্সি রিফর্ম করে ওওপি ১৫%-এ নামিয়েছে, এবং এখন তাদের ইউএইচসি গ্লোবাল মানদণ্ডে—বাজেট বৃদ্ধি ছাড়াই প্রধানত রিফর্মের মাধ্যমে।
জিডিপির শতাংশ বাড়ানো কেন সমাধান নয়, তা বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্র (ইউএসএ) এবং ভারতের উদাহরণ দেখুন। ইউএসএ-তে স্বাস্থ্য খরচ জিডিপির ১৮% (২০২৩-২৪), যা বিশ্বের সর্বোচ্চ, কিন্তু তারপরও ইউএইচসি অর্জিত হয়নি। অনেক মানুষ সুরক্ষিত না , উচ্চ OOP খরচের কারণে চিকিত্সা-সম্পর্কিত দেউলিয়া ঘটে, এবং অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় গড় আয়ু কম এবং স্বাস্থ্য ফলাফল খারাপ (কমনওয়েলথ ফান্ড রিপোর্ট, ২০২৩)। অদক্ষতা এবং প্রাইভেট-হেভি সিস্টেমের কারণে এটি ঘটেছে। অনুরূপভাবে, ভারতে স্বাস্থ্য খরচ জিডিপির ৩.৮% (২০২২), যা ২০১৪-১৫-এর ৩.৮৯% থেকে সামান্য হ্রাস পেলেও সরকারি অংশ ১.৮-২% বাড়ছে, কিন্তু UHC অর্জিত হয়নি। OOP ৪৭% এখনও উচ্চ, এবং অদক্ষতা (যেমন দুর্বল গভর্ন্যান্স এবং অপচয়) কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যের মুখোমুখি (ইকোনমিক সার্ভে, ২০২৪-২৫)। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে শুধু খরচ বাড়ালে ইউএইচসি অর্জিত হয় না; অদক্ষতা দূর করা অপরিহার্য।
জিডিপির শতাংশ বাড়ানোর পরিবর্তে এই রিফর্মগুলো ফোকাস করলে, OOP ৫০%-এ নামবে এবং SCI ৭০-এ পৌঁছাবে—যা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় দেশ করে তুলবে। এটি না শুধু স্বাস্থ্য উন্নয়ন করবে, বরং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে, কারণ সুস্থ জনশক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।
