বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা প্রধানত ট্যাক্স–ভিত্তিক, যেখানে সরকারি বাজেট থেকে পাবলিক হেলথ ফ্যাসিলিটিগুলোকে অর্থায়ন করা হয়। তবে, UHC অর্জনের জন্য এই মডেল যথেষ্ট নয়। নীতিগতভাবে, আমাদের একটি হাইব্রিড মডেল গ্রহণ করতে হবে, যা ট্যাক্স–ভিত্তিক সিস্টেমের সাথে ন্যাশনাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স (NHI) বা সোশ্যাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স (SHI) যুক্ত করে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সুরক্ষা প্রদান করবে। এই নীতি SDG 3 (ভালো স্বাস্থ্য ও কল্যাণ) অর্জনের সাথে সংগতিপূর্ণ, যা ২০৩০ নাগাদ UHC সার্ভিস কভারেজ ইনডেক্সকে ৬৫–এ উন্নীত করার লক্ষ্য রাখে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, বর্তমানে এই ইনডেক্স মাত্র ৫৪/১০০, এবং প্রায় ৪১.৭% জনগোষ্ঠী আউট–অফ–পকেট (OOP) খরচের কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নীতি নির্ধারকদের OOP কমিয়ে ৩৫%-এ নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, যা WHO-এর UHC রোডম্যাপ ২০২৬–২০৩৫ অনুসারে একক পুলড ফান্ড এবং কমপ্রিহেনসিভ বেনিফিট প্যাকেজের মাধ্যমে সম্ভব।
বর্তমান নীতিগত বাস্তবতায় স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখযোগ্য। পার–ক্যাপিটা স্বাস্থ্য খরচ প্রতি ব্যক্তি মাত্র $১৫১ (২০২৬ অনুমান), যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় নিম্ন। জিডিপির মাত্র ২.৩৬% স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়, যার সরকারি অংশ ০.৭৪% (২০২৫ ফিসকাল ইয়ার), যা বিশ্ব গড়ের (৬.৭%) চেয়ে অনেক কম। OOP খরচ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ (৭৩%), যা ৪৬% হাইপারটেনসিভ রোগীদের মধ্যে ক্যাটাস্ট্রফিক হেলথ এক্সপেন্ডিচার (CHE) ঘটায় এবং পরিবারগুলোকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়া, হেলথ ওয়ার্কফোর্সের ঘাটতি, নন–কমিউনিকেবল ডিজিজ (NCD) বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নীতিগত হস্তক্ষেপ দাবি করে। নীতি নির্ধারকদের এই চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৫% বরাদ্দ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নীতিগত সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার (PHC) শক্তিশালীকরণ অপরিহার্য। এটি ছাড়া কোনো সিস্টেম দীর্ঘমেয়াদী হবে না। নীতিমালায় জেনারেল প্র্যাকটিশনার (GP) সিস্টেম চালু করে প্রাইমারি লেভেলে রোগ নির্ণয় এবং রেফারেল উন্নত করতে হবে। ম্যানপাওয়ার এবং লজিস্টিকসের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় স্ট্র্যাটেজিক পারচেসিং নীতি গ্রহণ করা দরকার, যেমন টাস্ক–শিফটিং গাইডলাইনস চালু। পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) কে নীতিগতভাবে কার্যকর করে NCD নিয়ন্ত্রণে প্রাইভেট সেক্টরের সহযোগিতা নেওয়া যাবে। এছাড়া, আইটি ইন্টিগ্রেশন (ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড), কমিউনিটি পার্টিসিপেশন এবং কোয়ালিটি ফোকাস নিশ্চিত করার জন্য নীতিগত ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, যেমন ক্লাইমেট–হেলথ লিঙ্কস ট্রেনিং প্রোগ্রাম। ৫ম হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন সেক্টর প্রোগ্রাম (HPNSP) অনুসারে, PHC-কে NCD নিয়ন্ত্রণের মূল স্তম্ভ করে OOP ৩২%-এ কমানোর নীতি গ্রহণ করা যাবে।
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া UHC বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ট্যাক্স–ভিত্তিক সিস্টেমে ফাইন্যান্সিয়াল মেকানিজম (যেমন রিফান্ড) এবং PHC-এর জন্য শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করতে হবে। হেলথ রিফর্ম কমিশনের সুপারিশ অনুসারে একটি স্বতন্ত্র হেলথ কমিশন গঠন করে রেকমেন্ডেশনগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের নীতি গ্রহণ করা জরুরি। হেলথ কেয়ার ফাইন্যান্সিং স্ট্র্যাটেজি ২০২৬–২০৩৫ অনুসারে, পুলড ফান্ডিং বাড়ানো এবং OOP কমানোর রোডম্যাপ অনুসরণ করতে হবে, যা ওষুধ, ডায়াগনস্টিকস এবং ওয়ার্কফোর্সে বিনিয়োগ বাড়াবে। ন্যাশনাল হেলথ কমপ্যাক্টে সোশ্যাল প্রোটেকশন স্কিমগুলোকে ভালনারেবল গ্রুপের সাথে ইন্টিগ্রেট করার নীতিগত প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
উপসংহারে, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও SDG অর্জনের জন্য একটি সাস্টেনেবল নীতিগত মেকানিজম অপরিহার্য। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং ডোনার সাপোর্ট (যেমন WHO, World Bank) সাথে যদি আমরা হাইব্রিড মডেল, PHC শক্তিশালীকরণ এবং আইনি সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করি, তবে ভবিষ্যতে একটি কার্যকর, সুষ্ঠু ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এই নীতিগত ফোকাস বাংলাদেশকে স্বাস্থ্য খাতে একটি মডেল দেশে পরিণত করতে পারে।
