বাংলাদেশে রূপান্তরমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা(Transformative Health System Reform) সংস্কারের রোডম্যাপ: সার্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজের(UHC) জন্য ব্যবস্থাগত পরিবর্তনকে(Systemic Change) অগ্রাধিকার দেওয়া:

বাংলাদেশে রূপান্তরমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা(Transformative Health System Reform) সংস্কারের রোডম্যাপ: সার্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজের(UHC) জন্য ব্যবস্থাগত পরিবর্তনকে(Systemic Change) অগ্রাধিকার দেওয়া:
বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতি এখন “সকলের জন্য স্বাস্থ্য” এবং ২০৩০-২০৩২ সালের মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজ (ইউএইচসি) অর্জনের দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নতুন ম্যান্ডেট পেয়েছে। জীবন প্রত্যাশা বৃদ্ধি, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর তীব্র হ্রাস এবং শৈশবকালীন টিকাদানের প্রায় সার্বজনীনতার মতো অসাধারণ অর্জন আমাদের একটি শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
কিন্তু গভীর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে: ইউএইচসি সার্ভিস কভারেজ সূচক মাত্র ৫৪/১০০, আউট-অফ-পকেট খরচের কারণে জনসংখ্যার ৪১.৭ শতাংশ (প্রায় ৭ কোটি মানুষ) আর্থিক দুর্দশায় পড়ছে, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট মাত্র জিডিপির ০.৬৭ শতাংশ, জনবলের সংকট, খণ্ডিত শাসনব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারি সেবাদানকারীদের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন (২০২৪ সালে গঠিত, ২০২৫ সালের মে মাসে প্রতিবেদন দাখিল) একটি সাহসী খসড়া দিয়েছে: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিনামূল্যে প্রদান; একটি স্বাধীন ও স্থায়ী বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন গঠন; স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসন থেকে আলাদা করে ক্যাডার পুনর্গঠন; এবং এসব বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন বা সংশোধন। কিন্তু এই সুপারিশগুলো এখনও কাগজেই রয়ে গেছে।
নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সঠিকভাবেই ১ লক্ষ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ (৮০ শতাংশ নারী), প্রত্যেক ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো সম্প্রসারণ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য জোরদার এবং উচ্চব্যয়ের চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ ও প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে—শুধু লোকবল বা সুবিধা বাড়ালেই টেকসই ফল হয় না। গভীর সংস্কার ছাড়া এগুলো পুরনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হারিয়ে যায়।
সত্যিকারের রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন শীর্ষ থেকে নিচ পর্যন্ত, পুরো সরকারের অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি। সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাস্থ্য সংস্কার টাস্কফোর্স গঠন করা। প্রধানমন্ত্রী বা একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত এই টাস্কফোর্সে স্বাস্থ্য, অর্থ, পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার, আইসিটি মন্ত্রীসহ স্বাস্থ্য কমিশন, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী এবং সামনের সারির স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিনিধি থাকবে। এটি মন্ত্রণালয়ের সিলো ভেঙে আমলাতান্ত্রিক জড়তা দূর করবে।
থাইল্যান্ডের ইউনিভার্সাল কভারেজ স্কিম (২০০২) এবং রুয়ান্ডার পোস্ট-১৯৯৪ সংস্কার—দুটোই প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের নেতৃত্ব, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে গেটকিপার হিসেবে ব্যবহার করে সফল হয়েছে। আউট-অফ-পকেট খরচ কমিয়ে সার্বজনীন কভারেজ অর্জন সম্ভব হয়েছে। একইভাবে কোস্টা রিকাও শীর্ষ নেতৃত্বে একই সাফল্য পেয়েছে।
টাস্কফোর্সের অবিলম্বে অগ্রাধিকার কাজগুলো হবে:
১. স্থায়ী সংস্কার কাঠামো প্রতিষ্ঠা: স্বাধীন বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন গঠন; প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আইন প্রণয়ন করে প্রাথমিক সেবাকে সাংবিধানিক অধিকার ও বিনামূল্যে ঘোষণা; প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতাল অধ্যাদেশ আধুনিকীকরণ।
২. জনবল ও সেবা মডেল সংস্কার: আলাদা স্বাস্থ্য সেবা ক্যাডার গঠন; নির্বাচিত উপজেলায় পারিবারিক চিকিৎসক (জিপি) ব্যবস্থা পাইলটিং; রেফারেল পথ স্পষ্ট করা।
৩. টেকসই অর্থায়ন ও সুরক্ষা: দরিদ্র ও দুর্বলদের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা চালু; একক পুল ফান্ডের দিকে অগ্রসর হওয়া; স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য পূরণ।
৪. প্রযুক্তি ও অংশীদারিত্ব: জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (ইলেকট্রনিক রেকর্ড, টেলিমেডিসিন, সাপ্লাই চেইন মনিটরিং) চালু; পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক গঠন।
৫. সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ও প্রতিরোধ: ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্য কমিটি শক্তিশালী করা; প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য, এনসিডি এবং অধিকার বিষয়ে জাতীয় সচেতনতা অভিযান।
এই কাজগুলো পরস্পর সম্পর্কিত। টাস্কফোর্স স্পষ্ট মাইলফলক নির্ধারণ করে স্বচ্ছ ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে জাতীয় সংসদ ও জনগণের কাছে প্রতিবেদন দেবে।
বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফসহ উন্নয়ন সহযোগীরা ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের ন্যাশনাল হেলথ কম্প্যাক্টের মাধ্যমে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
বিকল্প পথ—পুরনো ব্যবস্থায় শুধু নতুন লোকবল যোগ করা—অদক্ষতা, বৈষম্য ও এসডিজি ৩ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা ডেকে আনবে। বিশ্বের সাফল্যের গল্পগুলো একটাই কথা বলে: রাজনৈতিক সর্বোচ্চ নেতৃত্ব, আইনি ভিত্তি, শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পুলড ফাইন্যান্সিং ছাড়া সার্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজ সম্ভব নয়।
নতুন সরকারের কাছে এখন ম্যান্ডেট ও সুযোগ দুটোই আছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টাস্কফোর্স গঠন করে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশ তার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে খণ্ডিত ও ঝুঁকিপূর্ণ থেকে সুসংহত, ন্যায়ভিত্তিক ও সত্যিকারের সার্বজনীন করে তুলতে পারবে। ১৭ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য এবং জাতির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন এখন এই সাহসী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। এটি শুধু স্বাস্থ্য সংস্কার নয়—এটি জাতি গঠনের মৌলিক কাজ।
সরকার যদি এখনই দূরদর্শিতা ও জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করে, তাহলে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে এক নতুন সাফল্যের উদাহরণ হয়ে উঠবে।