যুক্তরাষ্ট্র কেন সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (Universal Health Coverage – UHC) অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে ??…

যুক্তরাষ্ট্র (ইউএসএ) বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ হলেও ইউএইচসি অর্জন করতে পারেনি, যা একটি উন্নত অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক। ২০২৩-২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খরচ জিডিপির ১৮% (প্রায় ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলার), যা বিশ্বের সর্বোচ্চ, কিন্তু ২৭.৬ মিলিয়ন আমেরিকান (সকল বয়সের ৮.৬%) স্বাস্থ্য বীমা ছাড়াই রয়েছে। এই ব্যর্থতার কারণগুলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সিস্টেমিক। নীচে ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করা হলো, তথ্যসূত্রসহ। (সম্পাদনায় তুলনার ন্যায্যতা যোগ করা হয়েছে এবং কিছু অংশ সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে যাতে ফোকাস স্পষ্ট হয়।)

১. রাজনৈতিক কারণসমূহ

  • রাজনৈতিক বিভাজন এবং লবিং: যুক্তরাষ্ট্রে ইউএইচসি-এর প্রচেষ্টা ১৯৪০-এর দশক থেকে শুরু হয়েছে (যেমন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান, নিক্সন, ক্লিনটনের প্রস্তাব), কিন্তু সবগুলো ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (এএমএ)-এর মতো লবিগ্রুপগুলো জাতীয় স্বাস্থ্য বীমাকে বিরোধিতা করেছে, যা “সোশ্যালিজম” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালে নিক্সনের প্রস্তাব (যা ফেডারেল হেলথ ইনস্যুরেন্সে অ্যাক্সেস বাড়ানোর লক্ষ্য ছিল) ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে ব্যর্থ হয়।
  • পার্টিজানশিপ: রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিভাজন (যেমন অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট বা ওবামাকেয়ারের বিরোধিতা) ইউএইচসি-কে বাধা দেয়। সিনেটে সুপারমেজরিটির দরকার (৬০ ভোট) এবং কমিটি চেয়ারম্যানদের ক্ষমতা প্রক্রিয়াকে জটিল করে।

২. অর্থনৈতিক এবং সিস্টেমিক কারণসমূহ

  • প্রাইভেট-ভিত্তিক সিস্টেম: যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মূলত প্রাইভেট, যেখানে এমপ্লয়ার-স্পনসর্ড ইনস্যুরেন্স প্রধান। এতে ৫০ মিলিয়ন মানুষ (১৬%) বীমাহীন। অর্থনৈতিক মন্দায় (যেমন কোভিড-১৯) চাকরি হারালে বীমা হারানো যায়। ওওপি খরচ উচ্চ (এভারেজ ডিডাকটিবল $৩,০৬৪), যা চিকিত্সা-সম্পর্কিত দেউলিয়া ঘটায়।
  • উচ্চ খরচ এবং অদক্ষতা: স্বাস্থ্য খরচ প্রতি ব্যক্তি $১২,৫৫৫ (২০২২), কিন্তু ফলাফল খারাপ: লাইফ এক্সপেকটেন্সি ৭৬.১ বছর (অন্যান্য উন্নত দেশের চেয়ে কম), শিশুমৃত্যু হার উচ্চ, এবং অ্যাভয়ডেবল ডেথ রেট সর্বোচ্চ। প্রাইমারি কেয়ার এবং প্রিভেনটিভ সার্ভিসের অভাব, অস্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল (যেমন ওবেসিটি, ভায়োলেন্স) এবং দারিদ্র্য কারণ। পাবলিক-প্রাইভেট মিক্স জটিল, যা সিস্টেমকে অদক্ষ করে।
  • সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কারণ: আমেরিকানরা নিজেদের “মিডল ক্লাস” হিসেবে দেখে, যা ওয়ার্কিং ক্লাস-ভিত্তিক লেবার পার্টি গঠন করে না। ফলে ইউএইচসি-এর মতো সামাজিক প্রোগ্রামের সমর্থন কম।

বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা দেখায় যে শুধু উচ্চ খরচ (জিডিপির ১৮%) সাফল্য নিশ্চিত করে না; অদক্ষতা, রাজনৈতিক লবিং এবং প্রাইভেট সেক্টরের অত্যধিক প্রভাব সিস্টেমকে অসমতুল করে। অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট (২০১০) কভারেজ বাড়িয়েছে (১৮% থেকে ৮.৬%-এ হ্রাস), কিন্তু এখনও ইউএইচসি নয়। এতে স্বাস্থ্য বৈষম্য বেড়েছে: দরিদ্র এবং সংখ্যালঘু জাতিগত গ্রুপগুলোতে অ্যাক্সেস কম। অর্থনৈতিক খরচ: অবীমাকৃতদের চিকিত্সা বিল $৪২.৪ বিলিয়ন/বছর (২০১৫-১৭), যা ট্যাক্সপেয়ারদের উপর বোঝা।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

বাংলাদেশ, যার SCI ৫৪ এবং ওওপি 72 %, UHC অর্জনে (২০৩২ লক্ষ্য) যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। নীচে মূল শিক্ষা এবং সুপারিশ:

১. রাজনৈতিক এবং গভর্ন্যান্স শিক্ষা

  • রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শক্তিশালী করুন: যুক্তরাষ্ট্রের মতো পার্টিজানশিপ এড়াতে রাজনৈতিক ঐক্যমত্য গড়ে তুলুন। বাংলাদেশের হেলথ ফাইন্যান্সিং স্ট্র্যাটেজি (২০১২-৩২) এবং ইউএইচসি রোডম্যাপ (২০২৬-৩৫) বাস্তবায়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমান। লবিং এড়াতে প্রাইভেট সেক্টরকে রেগুলেট করুন।
  • গভর্ন্যান্স উন্নয়ন: যুক্তরাষ্ট্রের অদক্ষতা (যেমন প্রাইভেট-পাবলিক মিক্সের জটিলতা) থেকে শিখে বাংলাদেশে দুর্নীতি, অ্যাকাউন্টেবিলিটি এবং মনিটরিং উন্নয়ন করুন। ডিজিটাল সিস্টেম চালু করে অ্যাবসেন্টিজম কমান।

২. অর্থনৈতিক শিক্ষা

  • খরচ বাড়ানোর পরিবর্তে এফিসিয়েন্সি ফোকাস: যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ খরচ সত্ত্বেও ব্যর্থ, কারণ অদক্ষতা। বাংলাদেশে জিডিপির ২.৬৪% স্বাস্থ্য খরচ (দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন) বাড়ানোর আগে বর্তমান রিসোর্স অপটিমাইজ করুন। এফিসিয়েন্সি বাড়ালে ইউএইচসি ৪-৮% উন্নত সম্ভব।
  • ওওপি হ্রাস এবং ফাইন্যান্সিয়াল প্রোটেকশন: যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ OOP দারিদ্র্য সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে ৯% পরিবার ক্যাটাস্ট্রফিক খরচে পড়ে, ৫.৭ মিলিয়ন দরিদ্র হয়। হেলথ ইনস্যুরেন্স পাইলট  বিস্তার করুন এবং পুলিং ফান্ড চালু করুন।

৩. সামাজিক এবং সার্ভিস-ভিত্তিক শিক্ষা

  • প্রাইমারি কেয়ার এবং প্রিভেনশন ফোকাস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রাইমারি কেয়ারের অভাব অস্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল বাড়ায়। বাংলাদেশে ডাবল বার্ডেন অফ ডিজিজ (সংক্রামক এবং অসংক্রামক রোগ) মোকাবিলায় পিএইচসি (কমিউনিটি ক্লিনিক) শক্তিশালী করুন। মানবসম্পদের ঘাটতি (ডাক্তার-রোগী অনুপাত ১:১৫৮১) পূরণ করুন।
  • বৈষম্য হ্রাস: যুক্তরাষ্ট্রে জাতিগত এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য উচ্চ। বাংলাদেশে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য (গ্রাম-শহর, দরিদ্র-ধনী) কমাতে জনসচেতনতা এবং কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট বাড়ান।

বিশ্লেষণ এবং সুপারিশ

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা দেখায় যে ইউএইচসি অর্জন খরচের উপর নির্ভর করে না, বরং সিস্টেমিক রিফর্মের উপর। বাংলাদেশের জন্য হাইব্রিড অ্যাপ্রোচ: এফিসিয়েন্সি বাড়ান (যেমন এইচআর প্ল্যানিং, ডিজিটাল মনিটরিং), প্রাইভেট সেক্টর রেগুলেট করুন, এবং ধাপে ধাপে কভারেজ বিস্তার করুন। ডোনার সাপোর্ট (যেমন ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক) ব্যবহার করে পিএইচসি-তে বিনিয়োগ করুন। এতে ওওপি কমবে, এসসিআই বাড়বে, এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া এটি সম্ভব নয়—যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যর্থতার মূল কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুলনা করার ন্যায্যতা

যুক্তরাষ্ট্রের (ইউএসএ) সাথে তুলনা করা হয়েছে কারণ এটি একটি চরম উদাহরণ যা দেখায় যে স্বাস্থ্য খাতে উচ্চ ব্যয় (জিডিপির শতাংশ) সত্ত্বেও ইউএইচসি অর্জন সম্ভব নয় যদি সিস্টেমিক অদক্ষতা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং দুর্বল গভর্ন্যান্স থাকে। বাংলাদেশের মতো নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের জন্য এই তুলনা শিক্ষণীয়, কারণ আমরা প্রায়শই মনে করি অর্থ বাড়ালে সব ঠিক হবে”। কিন্তু USA দেখায় যে অর্থের সাথে এফিসিয়েন্সি এবং রিফর্ম না থাকলে ফলাফল খারাপ হয়। এটি বাংলাদেশকে সতর্ক করে যে বাজেট বৃদ্ধির আগে অভ্যন্তরীণ সমস্যা (যেমন দুর্নীতি, অদক্ষ ম্যানেজমেন্ট) সমাধান করতে হবে। উন্নত দেশের এই ব্যর্থতা আমাদেরকে “অর্থ-কেন্দ্রিক” চিন্তা থেকে “সিস্টেম-কেন্দ্রিক” চিন্তায় নিয়ে যায়, যা LMICs-এর জন্য প্রযোজ্য (ডব্লিউএইচও রিপোর্ট, ২০২৩)। এই তুলনা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদেরকে অনুপ্রাণিত করে যে সীমিত সম্পদ দিয়েই সফলতা সম্ভব, যদি রিফর্ম প্রথমে করা হয়।